বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আলো জ্বেলে ছিলেন তিনি

By: মনিস রফিক ২০২০-০৮-১৪ ১:৪৬:২২ পিএম আপডেট: ২০২৪-০৫-৩০ ৬:৪০:০১ এএম ইতিহাস

প্রাক-পর্ব

১৮৯৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ফ্রান্সের --লুই ল্যুমিয়ের ও অগাস্ত ল্যুমিয়ের যখন প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শনী করেন তখন গোটা বিশ্ব তাক লেগে যায়। মানুষের ধারণাই ছিলো না তারা পর্দায় এমনভাবে ছুটন্ত মানুষজন, গাড়ী-ঘোড়া আর দৃশ্য দেখবে। সেই ছিল পৃথিবীর বুকে প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। ফ্রান্সের সেই প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মাত্র দুই বছরের মধ্যে ঢাকায় চলচ্চিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করেন জনৈক ইংরেজ সাহের মিঃ স্টিফেন্স। আর বিশ্ব চলচ্চিত্র যাত্রার মাত্র তিন বছরের মধ্যেই ভারতবর্ষে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ ভাবনায় এগিয়ে আসেন আমাদের ঢাকার মানিকগঞ্জের বকজুরী গ্রামের হীরালাল সেন। ১৮৯৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠিত করলেন ‘রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানী’  আর ১৯০৩ সালে ভারত উপমহাদেশে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করে এক নতুন যুগের সূচনা করেন। ভারত উপমহাদেশে চলচ্চিত্র নির্মাণে পথিকৃত হীরালাল সেন ঢাকার সন্তান হলেও তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন সেই সময়ের ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতায়।


বিশ্বের চলচ্চিত্র যাত্রার সামান্য কয়েক বছরের মধ্যেই এটা হয়ে উঠে অন্যতম এক প্রচার, বিনোদন আর অর্থ উপার্জনের মাধ্যম। পৃথিবীর বড় বড় শহরগুলোতে ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। বোম্বে ও কলকাতাকে ঘিরে এই উপমহাদেশ এগুতে থাকে। কিন্তু যে ঢাকার এক সন্তানের হাত ধরে এই উপমহাদেশে চলচ্চিত্র হাঁটতে শুরু করে সেই ঢাকা একেবারে অকর্ষিত থেকে যায় চলচ্চিত্র যাত্রায়। 


গোটা বিশ্বে এমনকি কলকাতায় চলচ্চিত্র যখন পূর্ণতার পথে এগিয়ে চলেছে পূর্ণ দমে তখন অর্থাৎ ১৯২৭ সালে ঢাকার নবাব বাড়ীর কয়েকজন সংস্কৃতিমনা ছেলে একেবারে সৌখিনতার বশে বানিয়ে ফেলে স্বল্পধৈর্ঘ্যের ছবি সুকুমারী। পরিচালক ছিলেন অম্বুজ গুপ্ত। এ ছবির সফলতার পর সুকুমারী’র সদস্যরাই ১৯৩১ সালে পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র দ্য লাস্ট কিস তৈরি করলেন। ১২ রীলের এই নির্বাক ছবিটির পরিচালকও ছিলেন জগন্নাথ কলেজের শরীর চর্চার প্রশিক্ষক ও নামকরা নাট্য পরিচালক অম্বুজ গুপ্ত। সেই বছরের শেষের দিকে ঢাকার সেই সময়ের ‘মুকুল’ হলে ছবিটি মুক্তি দেয়া হয়। এ ছবির উদ্বোধন করেন সেই সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক ও প্রথিতযশা ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার।


বিশ্ব চলচ্চিত্র তখন মহা গতিতে এগিয়ে চলেছে। পৃথিবীর বিখ্যাত সব ক্ল্যাসিক ছবি তৈরি হতে শুরু হয়েছে। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর লেলিন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য যে অনুপ্রেরণার আহ্বান জানিয়ে কুলেশভ, পুদোভকিন আর আইজেনস্টাইনের দলকে জাগিয়ে তুলেছিলেন আর রাশিয়ায় চলচ্চিত্র নির্মাণ অবকাঠামো গড়ে তুলেছিলেন তার ফসল ফলতে শুরু করেছে। সেই সময়ও অবকাঠামোগত অনুপস্থিতির জন্য ঢাকায় তেমন কোনো চলচ্চিত্র তৈরি হচ্ছিল না। সুকুমারী ও দ্য লাস্ট কিস’র শুটিং ঢাকাতে হলেও এর কারিগরী এবং শুটিং সরঞ্জামের যাবতীয় জিনিসপত্র আনা হয়েছিল কলকাতা থেকে।
১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানের প্রথম সেক্রেটারী জেনারেল কায়েদে আজম জিন্নাহ দশ দিনের সফরে তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় আসেন। মিঃ জিন্নাহর এই ঐতিহাসিক সফরকে স্মৃতিবন্দী করে রাখার জন্য সরকারী উদ্যেগে একটি প্রামাণ্যচিত্র করার উদ্যেগ গ্রহণ করা হয়। ঢাকার সন্তান ও ঢাকা বেতার কর্মী নাজির আহমেদকে এ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের দায়িত্ব দেয়া হয়। প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের যাবতীয় জিনিসপত্র কলকাতার অরোরা ফিল্ম স্টুডিও থেকে এনে নাজির আহমেদ সেই দশ দিনের শুটিং এ তৈরি করেন ইন আওয়ার মিডস্ট। পরে ১৯৫৪ সালে নাজির আহমেদ ঢাকার এক রাজমিস্ত্রীর জীবনকাহিনি নিয়ে তৈরী করলেন আরেকটি প্রামাণ্যচিত্রসালামত। উল্লেখ্য, এই ছবি তৈরির যাবতীয় জিনিসপত্র আনা হয় কলকাতা থেকে।


নির্মাণ পর্ব

চলচ্চিত্র তৈরির অগ্রযাত্রার পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ঢাকায় চলচ্চিত্র তৈরির জন্য সামান্য অবকাঠামো টুকুও গড়ে ওঠেনি। ১৯৫৩ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকার সচিবালয়ে পূর্ববংগ সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিচালক ড. আব্দুস সাদেক স্থানীয় সংস্কৃতিসেবী, চলচ্চিত্র পরিবেশক ও প্রদর্শকদের এক সভা আহ্বান করেন। ড. সাদেক পরিসংখ্যান ব্যুরোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন, ফলে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের মনোভাব ভালোভাবে জানতেন। তিনি উক্ত সভায় চলচ্চিত্রে পূর্ব বংগের অনগ্রসরতার কারণ তুলে ধরে তার সমাধানের ইংগিত দেন। পূর্ব বংগকে স্বাবলম্বী করার জন্যই তিনি প্রদেশে চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি প্রদেশে ৯২টি প্রেক্ষাগৃহে বিদেশি ছবির বদলে যাতে স্থানিয় ছবি প্রদর্শিত হয় সেজন্য দেশিয় ছবি তৈরীর কথা বলেন। ড. সাদেকের এই আহ্বানে সেই সভায় উপস্থিত এক অবাঙ্গালী চলচ্চিত্র ব্যবসায়ী ফজলে দোসানী ঔদ্ধত্যভাবে বলেন, এখানকার আবহাওয়া খারাপ, আদ্রতা বেশি। কাজেই এখানে ছবি তৈরি সম্ভব নয়। সেই সভায় উপস্থিত তেজস্বী বাঙ্গালী নাট্যকার আব্দুল জব্বার খান দোসানীর বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলেন, ‘কোলকাতায় যদি ছবি হতে পারে, তবে ঢাকায় হবে না কেনো? আমি প্রমথেশ বড়ুয়াকে ছবির শুটিং করতে দেখেছি। কোলকাতার বেশ কয়েকজন ছবির নির্মাতাও এখানে এসে ছবির শুটিং করেছেন। তাহলে এখানে ছবির শুটিং কেনো হবে না। মি. দোসানী আপনি জেনে রাখুন, আগামী এক বছরের মধ্যে যদি কেউ ছবি না করেন তবে আমি জব্বার খানই তা বানিয়ে প্রমাণ করবো।’ বলা যায় এই চ্যালেঞ্জের জবাব থেকেই পরের বছর আব্দুল জব্বার খান শুরু করেন বাংলাদেশ তথা পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সবাক বাংলা চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ-এর কাজ। ১৯৫৬ সালের ৩রা আগস্ট আব্দুল জব্বার খানের এ ছবিটি মুক্তি পায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও নারায়ণগঞ্জে। এর উদ্বোধন করেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক।


১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের পর জনসংযোগ বিভাগের অধীনে সরকারি প্রচারচিত্র তৈরীর জন্য ঢাকার তেজগাঁওস্থ বি. জি. প্রেসে স্থাপিত হয় প্রাদেশিক সরকারের চলচ্চিত্র শাখা। পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র তৈরির মত কোনো স্টুডিও ল্যাবরেটরি তখন ঢাকায় ছিলো না। বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলনের পর এখানে পূর্ণাঙ্গ ফিল্ম স্টুডিও স্থাপনের দাবি ক্রমেই জোরদার হয়। অন্যদিকে স্থানীয় চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীরা কখনোই চাইতো না ঢাকায় চিত্রশিল্প গড়ে উঠুক। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকারের পতন হলে যুক্তফ্রন্ট সরকার পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসে। শেখ মুজিবুর রহমান হন  শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী। 


ঢাকায় একটি স্থায়ী ফিল্ম স্টুডিও স্থাপনের ব্যাপারে মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের  সঙ্গে আলোচনা করেন আব্দুল জব্বার খান, ড. আব্দুস সাদেক, নূরুজ্জামান প্রমুখ। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁদেরকে স্টুডিও স্থাপনের ব্যাপারে একটি পরিকল্পনা তৈরি করতে বলেন। আব্দুল জব্বার খান ও তৎকালীন প্রাদেশিক সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) আবুল কালাম শামসুদ্দীন যৌথভাবে সরকারের কাছে একটি পরিকল্পনা পেশ করেন। সেই পরিকল্পনার প্রেক্ষিতে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রচেষ্টায় ১৯৫৫ সালের শেষের দিকে ইতালির একটি চলচ্চিত্র মিশন ঢাকায় আসে। ঐ মিশন স্টুডিও স্থাপনের ব্যাপারে সরকারকে পরামর্শ দেয়। ১৯৫৬ সালে শিল্প ও  বাণিজ্য মন্ত্রীর উদ্যেগে সরকার প্রদেশে চলচ্চিত্র শিল্প প্রসারের লক্ষ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করে।


১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিম পাকিস্তানের চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নের লক্ষ্যে ওখানে একটি সংস্থা গঠনের জন্য এক কোটি টাকা বরাদ্দের উদ্যেগ নেয়। এই অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য সমপরিমাণ অর্থ বরাদ্দের দাবি তোলেন প্রাদেশিক চলচ্চিত্র বিভাগের প্রধান নাজীর আহমেদ। 
নাজীর আহমেদ তখন শিল্প দপ্তরের সচিব আসগর আলীসহ শিল্প দপ্তরের উপ-সচিব আবুল খায়েরের মাধ্যমে বিষয়টি তৎকালীন শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের নজরে আনেন। শেখ মুজিবুর রহমান বিষয়টি শুনে অতি সত্ত্বর চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা প্রতিষ্ঠার বিলের একটি খসড়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরী করার নির্দেশ দেন। তখন প্রাদেশিক আইন পরিষদের অধিবেশন শেষ হতে মাত্র দু'দিন বাকি ছিল। এই অবস্থায় নাজীর আহমেদ ও আবুল খায়ের এফডিসি বিলের কাগজপত্র তৈরী করেন।


১৯৫৭ সালের ৩রা এপ্রিল প্রাদেশিক আইন পরিষদের অধিবেশনের শেষ দিন সকালে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা বিল উত্থাপন করেন। সেদিন পরিষদের উপস্থিত ছিলেন ১১ জন মন্ত্রী ও ২৫০ জন সদস্য আর স্পিকার ছিলেন আব্দুল হাকিম। বিল উত্থাপনের পর প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য আব্দুল মতিন, ইমদাদ আলী ও মনীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য সামান্য সংশোধনী আনেন। সংশোধনীর পর বিলটি বিনা বাধায় আইন পরিষদের পাশ হয়। 


উল্লেখ্য, তখন প্রদেশের গভর্ণর ছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক আর মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন আতাউর রহমান খান। 
নতুন বিলের ২৪ ধারা অনুযায়ী চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থার প্রধানতম দায়িত্ব ও উদ্দেশ্যাবলী ছিল

ক) চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং স্টুডিও প্রতিষ্ঠা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানীকে ঋণদান।

খ) ফিল্ম স্টুডিও নির্মাণের জন্য কোনো ব্যক্তি বা সংস্থাকে ঋণদান।

গ) নিজেদের স্টুডিও স্থাপন এবং চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ভাড়ার বিনিময়ে এসব স্টুডিও ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়া।

ঘ) চলচ্চিত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট গবেষণা স্কিমসমূহ চলচ্চিত্র শিল্প ও ক্ষুদ্র শিল্পের     উন্নয়নের জন্যে স্কিম প্রণয়ন ও সরকারে কাছে পেশ করা।

ঙ) চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে বিতরণের উদ্দেশ্যে ছবি তৈরি ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য ঋণদান।


প্রাথমিক পর্যায়ে এফডিসি (ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন)’র প্রশাসনিক দপ্তর চালু করা হয় বায়তুল মোকারম মসজিদের পেছন দিকে স্কাউট ভবনে (বর্তমানে লুপ্ত)। পরে সেগুনবাগিচার এক বাড়ীতে তা স্থানান্তর করা হয়। প্রাদেশিক তথ্য বিভাগের চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য তেজগাঁও রেল লাইনের পাশে যে শুটিং ফ্লোর ও ল্যাব ভবন (বর্তমানে যেখানে বিএফডিসি অবস্থিত) তৈরি হচ্ছিল সে এলাকাটি নবগঠিত সংস্থার অধীনে ন্যস্ত করা হয়। প্রাদেশিক জনসংযোগ বিভাগের চলচ্চিত্র শাখার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের এফডিসির অধীনে নেয়া হয়। ১৯৫৮ সালে এফডিসি সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করে। ১৯৫৯ সালে এফডিসি’র প্রশাসনিক ভবন বর্তমান স্থানে নেয়া হয়।


শেষ পর্ব

১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ৩৭ বছর বয়স্ক শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান যে দূরদর্শিতায় গণ পরিষদ অধিবেশনের একেবারে শেষ দিনে এফডিসি’র বিল পাশ করিয়ে এনে বাংলার চলচ্চিত্রপ্রেমীদের যে স্বপ্ন উপহার দিয়েছিলেন, তাঁর হাত ধরেই এর কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলার চলচ্চিত্র এক ঈর্ষণীয় উচ্চতায় উঠে আসে। তৈরী হতে থাকে  চলচ্চিত্র নির্মাতা সালাউদ্দিন, এ জে কারদার, জহির রায়হানের হাত দিয়ে কালজয়ী সব চলচ্চিত্র।

যৌবনের মন্ত্রী খোলা চোখে দেখেছিলেন চলচ্চিত্রের প্রশস্ত পথের স্বরূপ, তাঁর সেই দেখাটা ঝকঝকে আর স্পষ্ট ছিল বলেই গণ পরিষদ অধিবেশনের শেষ দিনে তিনি চলচ্চিত্র উন্নয়ন বিলটি পাশ করাতে পেরেছিলেন। তিনি সেই বিলটি পাশ করিয়েছিলেন বলেই  তৈরি হতে থাকে আমাদের মাতৃভূমিতে চলচ্চিত্র শিল্পের বলিষ্ঠ অবকাঠামো। ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল বাংলার চলচ্চিত্রের জন্য আলো এনে দেওয়া প্রাণ পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই বিলটি তাঁর স্বাপ্নিক দূরদর্শিতায় এত স্বল্প সময়ের মধ্যে পাশ করিয়ে না নিলে হয়তো জহির রায়হান আর অন্যান্য স্বপ্ন দেখানো চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্ম নাও হতে পারতো। আর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্প হয়তো সেই অন্ধকার অকর্ষিত জায়গাতেই আরো অনেক দশক ঘুরপাক খেত।

গণ পরিষদের সেই শেষ অধিবেশনের পরে দীর্ঘ বছর ধরে পাকিস্তানে চেপে বসেছিল সামরিক শাসন। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, সেই দীর্ঘ দিনের সামরিক শাসনে কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের প্রাণের দাবী করাচী, লাহোর বা রাওয়ালপিন্ডির সামরিক শাসকদের কর্ণকুহুরে কখনো পৌছতো না। বাংলার মাটিতে জন্ম নেয়া আর এই দেশের সাধারণ মানুষের আলো-বাতাস-স্বপ্নকে দেহ মনে মেখে নেয়া বঙ্গবন্ধুই কেবল ওমনভাবে বুঝতে পারতেন বাংলার মানুষের আশা আর প্রত্যাশাকে। সেজন্যই তাঁর হাত দিয়ে রচিত হয়েছিল অনেককিছুর সাথে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের অবকাঠামোর যাত্রা। 


- লেখক, সাধারণ সম্পাদক, টরন্টো ফিল্ম ফোরাম, কানাডা।